হেলেন

উনিশ শতকের রহস্যময়ী ও আশ্চর্য এক নারী হচ্ছেন ‘হেলেন কেলার’। বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে ১৮৮০ সালের ২৭ জুন উত্তর আমেরিকার টুস্কুমরিয়া নামে ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আথার কেলার এবং মায়ের নাম ক্যাথরিন। হেলেন কেলারের বয়স যখন মাত্র দেড় বছর তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা-মা প্রাণের প্রিয় কন্যার জীবনের আশা-ভরসা ছেড়ে দিলেও ভেঙে পড়েননি। চিকিৎসা করা শুরু করেন। তৎকালীন আমেরিকা পৃথিবীর একটি উন্নত দেশ হলেও আজকের মতো চ্যালেঞ্জিং চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। বহু চিকিৎসার পর জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। অন্ধকার, আলোহীন আর নিস্তব্ধে ছেয়ে যায় মায়ার জীবন ও জগৎ।
ফলে শিশুকালেই হেলেন কেলার একাধারে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয়ে বহুমুখী প্রতিবন্ধিত্ব নিয়েই বড় হতে থাকে। তার বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন বাবা-মা তাকে ওয়াশিংটনের এক প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী, টেলিফোন আবিষ্কারক ডা. আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে পরামর্শ গ্রহণের জন্য নিয়ে যান। কারণ আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল দীর্ঘদিন ধরে বাক-শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করছিলেন। তিনি হেলেন কেলারকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, হেলেন আর কোনো দিন চোখে দেখতে পাবে না এবং কানেও শুনতে পাবে না। তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ হেলেন কেলারের বুদ্ধিমত্তা তীক্ষè। সেজন্য গুরুত্বের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে।
পরিবারের উৎকণ্ঠা ও হতাশা কিছুটা হলেও কমে যায়। এরপর শুরু হয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। মাত্র আট বছর বয়সেই হেলেন কেলার হাতে আঙুল দিয়ে দাগ কেটে কেটে লেখা, ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়াসহ শব্দ ও বাক্য উচ্চারণ পর্যন্ত শিখে ফেলেন। এতে পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়স্বজন অবাক হয়ে যান। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় ছিল তার কথা শেখা। চোখে না দেখা ও কানে না শোনার দরুন প্রথমে একটি শব্দ ব্রেইলের মাধ্যমে জানতো। শিক্ষকের মুখের কম্পন, ঠোঁট ও জিহ্বার নড়াচড়া হাত দিয়ে অনুভব করে তা বোঝা ও অনুসরণ করার চেষ্টা করতো। প্রথম প্রথম যেসব শব্দ বলতো তা অদ্ভুত ধরনের বিকট শব্দের মতো উচ্চারিত হতো। তবুও নিরলস সাধনা করে অসাধ্যকেও সাধন করেছে, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
১৪ বছর বয়সে হেলেন আমেরিকার নিউইয়র্কের ‘রাইট হুমাসন’ নামক একটি স্কুলে ভর্তি হন। এখানে বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। স্কুল ফাইনাল পাস করার আগেই তার পিতা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। ১৯০৪ সালে হেলেন র‌্যাডক্লিফ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর নিজের প্রতিবন্ধিত্বের কথা উপলব্ধি করে তিনি সমাজের বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণমানুষের সহায়তা অর্জনে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। হেলেন কেলার পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে নতুন নতুন স্কুল এবং সমিতি গড়ে তোলেন।
১৯১৩ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য আমেরিকার জাতীয় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন কিন্তু তিনি দৃষ্টিসম্পন্ন বহু জ্ঞানী লোকের চেয়েও অধিক বেশি বই পড়েছেন। শুধু বই পড়েননি, বইও লিখেছেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ১১ খানা। প্রধান বই হচ্ছে দি স্টোরি অফ মাই লাইফ, লেট আস হ্যাভ কেইথ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন, ওপেন ডোর ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনা জীবনের বিষাদের ওপর একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রে তার নিজের ভূমিকায় তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন। তার জীবনের শেষ নেই। এই মহীয়সী নারীর জীবনের দিকে লক্ষ্য করলে মনে হয় পৃথিবীতে আশ্চর্য বলতে সত্যি কিছু নেই। তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী ছিলেন অথচ স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতে পারতেন। তার সঙ্গীত উপভোগ করার আশ্চর্য পদ্ধতি ছিল। তিনি বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলে দিতে পারতেন তাতে কী ধরনের সুর বাজছে। হাতের স্পর্শ দিয়ে তিনি শ্রবণের কাজ করতেন আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তা দ্বারা। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কি সঙ্গীত গাইছে। তার এমন আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহু দিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও তিনি নৌকা চালাতে পারতেন।
তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন, নৌকা বাইতে পারতেন, দাবা ও তাস খেলতে পারতেন। ঘরে বসে নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারতেন।
১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন। যুদ্ধ শেষ হলে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশ্বব্যাপী এক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস পান। ১৯৫৯ সালে হেলেন কেলার জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৬৮ সালের ১ জুন হৃদয়ের আলোতে আলোকিত এই মহীয়সী প্রতিবন্ধী নারী দুনিয়ার মায়া ছেড়ে স্বর্গে চলে যান। বিশ্বব্যাপী বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীর স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭ সালে ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি ওভারসিজ বাইন্ড’ গঠন করা হয়েছে। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল’ করা হয়েছে।
Advertisements
  1. Leave a comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: